মাসুম ভাই ভালো থাকুন, ওয়াশেক ভাই ফিরে আসুন

Sami-Ul-Washek
ফিরে আসুন ওয়াশেক ভাই।

চারপাশে ঘটা নানান ঘটনাকে লিংক করার চেষ্টা আমাদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। আমরা প্যাটার্ন খুঁজি। প্যাটার্ন পেলে সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবি। নিষ্ফল ভাবনা, তাও ভাবি।

২০০৯ সালে ঈদুল ফিতরের আগের রাতে শেষ রোজার ইফতার খেয়েছিলাম ক্যাপ্টেনস ওয়ার্ল্ডে জামি ভাই, আপ্পা আর জাইনের সাথে । ইফতার টিফতার খেয়ে বাসায় আসার দশ মিনিটের মধ্যে খামখেয়ালিপনার খেসারত দিয়ে কোমরের উপরে বেশ খানিকটা অংশ পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। ঘটনাটা ঘটেছিল প্রেশার কুকার লীক হয়ে। তারপর দৌড়াদৌড়ি ছুটোছুটি, ঈদের আগের রাতের ব্যস্ততার মধ্যে নতুন টেনশানের সংযোজন। মন না, মেজাজ খারাপ হচ্ছিল।

ঈদের দিন রুমি ভাইকে ফোন দেয়ার পর জানা গেল রুমি ভাই হসপিটালে, কারণ মাসুম ভাই আগের রাতে মারাত্মক কার অ্যাকসিডেন্ট করেছেন। এক বন্ধুর সাথে রাতে উত্তরা থেকে ফিরছিলেন, বন্ধু গাড়ি চালাচ্ছিল আর মাসুম ভাই ছিলেন পাশের সিটে। বন্ধুর দুই পা ভেঙ্গে গেছে, আর মাসুম ভাইয়ের “শরীরের নীচের অংশ তালগোল পাকিয়ে” গেছে। অ্যাকসিডেন্ট কোথায় হয়েছিল? ক্যাপ্টেনস ওয়ার্ল্ডের সামনে!

ঈদের দু’দিন পর কক্সবাজার যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ি। ফিরতি পথে সাতকানিয়ার কাছাকাছি এসে ব্যারি সেইন্ট এডমান্ডসে নেহান হওয়ার খবর পাই। তার পরদিন দিনের অলমোস্ট সেই একই ভাগে কুমিল্লায় এসে জানতে পারি মাসুম ভাই মারা গেছেন। এই দীর্ঘ স্ট্যাটাস যখন লিখছি তখন তিন বছর বয়সী নেহান আমার পাশে দাঁড়িয়ে চকলেট বিস্কিট খাচ্ছে। মাসুম ভাই এই পৃথিবীর কোথাও নেই।

ঐ মৃত্যুটা মেনে নেয়া কঠিন ছিল দু’টা কারণে। এক- মাসুম ভাই এমন একজন মানুষ যে ওনার সাথে “মারা যাওয়া” ব্যাপারটা যেন ঠিক যায় না; “ভালো মানুষ” বা “মানুষটা খুব ভালো” বলতে আমরা সাধারণত যা বোঝানোর চেষ্টা করি, সেটা ছিল মাসুম ভাইয়ের ক্ষেত্রে খুব জোরালো ভাবে সত্যি। দুই- বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন মাসুম ভাই। এ ধরণের মাসুম ভাইদেরকে ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে সিনামা নাটকে মরতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে মাসুম ভাইরা মারা গেলে সেই মায়েদের কী অবস্থা হয় সেটা চিন্তা করা আমার ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। কিন্তু এমন আইন নেই যে ভালো মানুষরা মরবে না। এমন আইনও নেই যে বিধবা মায়েদের একমাত্র সন্তানরা মরবে না। অতএব মানতে চাই আর নাই চাই, মেনে নিতেই হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মাসুম ভাইকে জান্নাত দান করুন। মাসুম ভাইয়ের আম্মার দুনিয়াকে সহজ করুন, আখিরাতে বেহেশত দিন, ওনার কথা মনে হলে এই দোআই করি। আর তো কিছু করার নাই।

ঢাকায় ফিরে দু’টা জিনিষ দেখেছিলাম। এক- শান্তিনগরে আমাদের গলির উলটো দিকে রাস্তার পাশে একটা প্রচন্ড ভাবে দলা পাকানো গাড়ি। রুমি ভাইয়ের কাছে জেনেছিলাম যে মাসুম ভাইয়ের সেই ‘বন্ধু’-র বাসা আমাদের গলির উলটো দিকে এবং ঐ দলাপাকানো গাড়িটাতেই মাসুম ভাইরা অ্যাকসিডেন্ট করেছিলেন। আর দুই- কয়েকদিন পরেই এনএসইউ থেকে ফেরার পথে দেখা গেল ফ্লাইওভার থেকে নেমে ক্যাপ্টেনস ওয়ার্ল্ডের উল্টোদিকে ফুটপাথের পাশের একটা নারিকেল গাছ ভাঙ্গা অবস্থায় পড়ে আছে। জানা গেল প্রচন্ড জোরে ফ্লাইওভার থেকে নেমেই ঐ গাছেই গিয়ে আছড়ে পড়েছিল মাসুম ভাইদের গাড়ি। নারিকেল গাছ কাটা কী জিনিষ সে সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তারা আন্দাজ করতে পারবেন মাসুম ভাইদের ক্র্যাশটা তাহলে কেমন ছিল।

৯৯ ব্যাচের সামিউল ওয়াশেক ভাইয়ের অ্যাকসিডেন্টের কথা জানার পর মাসুম ভাইয়ের কথা খুব খুব করে মনে হচ্ছে। ওয়াশেক ভাইয়ের সাথে আমার কখনও পরিচয় হয় নাই। কিন্তু অস্থির লাগার যে ব্যাপারটা সেটায় কোন তফাত পাচ্ছি না। একজন মানুষ যার বেঁচে ফেরার জন্য আমরা সবাই দোআ করছি, তার প্রসঙ্গে মাসুম ভাই যিনি মারা গেছেন তার কথা আনা ঠিক হল কিনা জানি না।

ওয়াশেক ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে দোআ করছি, সবাইকেও করতে বলছি। হার্ট বাদে ওনার সব অর্গানই খারাপ ভাবে ড্যামেজ হয়েছে। এতই ইনস্টেবল যে অপারেট করা যাচ্ছিল না। একটু আগে শুনলাম একটা অপারেশান হয়েছে। ও-পজিটিভ রক্ত নাকি খুব দরকার। আমার গ্রুপ ও-পজিটিভ। ঢাকায় থাকলে নিশ্চয়ই দিতাম। কিন্তু ব্যারি সেইন্ট এডমান্ডসে বসে যে দোআ ছাড়া আর কিছু করার নেই!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s